৫৯৮ মিনিট আগের আপডেট; দিন ৭:৪৩; মঙ্গলবার ; ০৮ মার্চ ২০২১

মৌলবাদের উত্থান নতুন নয় নব ও ভিন্ন রূপে আবির্ভাব

মাইনউদ্দিন হাসান শাহেদ ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১৭:২১

ভার্স্কয অপসারণ নিয়ে মৌলবাদ কিংবা উগ্রপন্থা নতুন করে জেগে উঠেছে তা নয়। তারা নানা সময়ে নানা ইস্যুতে দেশকে অস্থিতিশীল করে আসছে। তা বেশ পুরোনো ঘটনা। তারা তো দেশ স্বাধীন হোক তাও চায়নি। এর মাশুলও এই জাতি কম দেয়নি। তারপরও তারা তাদের মতোই ভাবে তাদের মতোই গুঁড়ামীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

মৌলবাদ কোনো দেশে শান্তি বা সমৃদ্ধি এনেছে তার নজির নেই। তারা কেবল রাষ্ট্র ও সমাজকে সাময়িক চাপে ফেলতে পারে। কিন্তু তাদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে কখনও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ভবিষ্যতেও পাবে তেমন ভাবার কোনো অবকাশ নেই। তবে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রপন্থা জাতি ও দেশের জন্য যে ক্ষতিকারক ও ঝুঁকিপূর্ণ তা আমরা অতীতের ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই। 

আমাদের দেশেও এই অপশক্তির উদ্ভব ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে। একসময় মৌলবাদ ও উগ্রপন্থা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও। মৌলবাদী ও উগ্রবাদীদের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো ব্যবহার করে বিশ্বে অশান্তি সৃষ্টি করে ফায়দা লুটার অভিযোগও আছে। আবার তারা মৌলবাদ ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা বলে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ করে ধ্বংস লীলাও চালিয়েছে। 

যাই হোক গত শুক্রবার রাতের কোনো একসময় কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য  ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এটা যে মৌলবাদীদের দ্বারা সংগঠিত তা তাদের সাম্প্রতিক কর্মকান্ডে বুঝা যায়। এই দুঃসাহসিক ঘটনায়  দেশের মানুষ হতচকিত। নড়েচড়ে বসছেন ক্ষমতাসীনরাও।গতকাল শনিবার থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ঘটনার প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সারাদেশে সভাসমাবেশও হচ্ছে। করোনাকালীন এই দুঃসময়ে মানুষকে আবার মৌলবাদ ও উগ্রবাদ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

অবশ্যই আমরা যেভাবে ভাবি বা দেখিনা কেন, মৌলবাদের শেকড় ও ডালপালা এখনও বিস্তৃত। তাদেরও রাষ্ট্রের চালকেরা নানা সময় আসকারা দিয়েছে পশ্রয় দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে,ব্যবহার করেছে। তা আমরা দেখছি,দেখে আসছি।

নিকট অতীতে দেখা যায়,২০০৪ সালে বাংলা ভাই ও শায়খ আবদুর রহমানদের উত্থান। তাদের উত্থানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা মানুষ দেখেছে। সেসময়ের বহুঘটনা মানুষ এখনো ভুলেনি। একবছরের মধ্যে সারাদেশে একযোগে বোমা হামলা ও ২১ আগস্টের গ্রেনেড় হামলা করে মৌলবাদীদের শক্তি জানান দিয়েছিল। সবই ছিলো মৌলবাদের হিংস্র রূপ। কিন্তু তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা তার দায় অস্বীকার করলেও পরবর্তীদের তাদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। তাদের বিদায়ের বেলায় বাংলা ভাই ও শায়খ রহমানদের বিরুদ্ধে অভিযানেও নামতে হয়েছিল। 

দেশের মানুষ দেখেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মৌলবাদী গোষ্ঠীর গ্রেনেড় হামলা থেকে ফিরে নতুন জীবন পেয়েছেন। তিনি মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এতদূর পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু তাদের নিস্তেজ করা যায়নি। তারা নয়া উদ্যমে,নয়াকৌশলে ও ভিন্নরূপে ডালপালা ছড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তার তীব্রতা বেড়েছে। হঠাৎ করে ভার্স্কযকে ইস্যু করে মাঠে নেমেছে। 

কথা হলো বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে প্রখ্যাত মুসলিম মনীষিদের ভাস্কর্য রয়েছে। তুরস্ক সেদেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশে কেন সমস্যা হচ্ছে তা ভাবার প্রয়োজন পড়েছে। তাদের উদ্দেশ্য উদঘাটন দরকার রয়েছে। তারা আসলে কি চায়? তারা তো ইতিমধ্যে অনেক সুযোগ সুবিধা ও  দাবিও আদায় করে নিয়েছেন সরকার থেকে। তারপরও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে তাদের এত ক্ষোভ কেন? নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধাকেরা তা নিয়ে ভাববেন। 

আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, তিনি কোন সময় মৌলবাদকে পশ্রয় দেননি। তিনি রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরোধিতা করেছেন। তিনি যদি সে মান্ধাতা আমলে ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচিয়ে বলতে পারেন। আমরা তো এখন জ্ঞান বিজ্ঞানে নতুন যুগে এসেছি। তাহলে এখন কেন মৌলবাদের কাছে জিম্মি থাকবো?

এ সময়ে একজন খ্যাতিমান লেখকের একটি বইয়ের লেখা মনে পড়ছে। সেখানে  পড়ে ধারনা পেয়েছিলাম মানুষ সভ্যতা গড়ে তোলার পর থেকে স্বার্থ নিয়েও দ্বন্দ্বে জড়ায়৷ এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই তারা একে অপরকে ঘায়েল করতে ধর্মের নানা ব্যাখ্যা গড়ে তুলতো। যে বেশি ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারতো জনসর্মথন তার পক্ষেই যেতো। এতে তারা ধর্মীয় গুরু বা যাজকদের ব্যবহার করতো। তাহলেই বুঝা যায় কত হাজার বছর আগেও মানুষ মৌলবাদ ও গুঁড়ামীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আজকের সভ্য সমাজে এসেছে। 

অবশ্যই আমাদের দেশের ইতিহাসের পরতে পরতে এমন ঘটনা কম নয়। ব্রিটিশ আমলে যখন বাঙ্গালীকে ইংরেজি শিক্ষার কথা বলা হলো,তখন বিজাতিদের ভাষা বলে তা শিখতে দেওয়া হয়নি। অথচ পরবর্তীতে মাদ্রাসাগুলোতেও ইংরেজি শিক্ষা চালু করা হয়েছে। এর পরের ঘটনা আরও ভয়ংকর। তারা দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানের পক্ষেই থাকতে চেয়েছিল। এই তো কয়বছর আগেও বেশিরভাগ মাদ্রাসায় জাতীয় পতাকা বা জাতীয় সংগীত বাজানো হতো না। এখন বাজায়। মানে যেটা আগে করার দরকার তা তারা পরে গিয়েই করেন বা বুঝেন।

সম্প্রতি সরকার কওমী মাদ্রাসাকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি কাটামোয় আনার কাজ করছেন। এতে তারা খুশী হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে কওমী জননী ঘোষণা করেছেন।

সবশেষে বলতে হয়, মৌলবাদ,সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষের বীরোচিত ইতিহাস রয়েছে। মানুষ কখনও মৌলবাদকে সমর্থন করেনি। এদেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছে। তাই এই দেশ মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের কাছে হারতে পারেনা। জেগে উঠুক প্রিয় স্বদেশ।

লেখক:

সিনিয়র সাংবাদিক

কক্সবাজার।


সর্বমোট পাঠক সংখ্যা : ৪১৩