৭২০ মিনিট আগের আপডেট; দিন ৫:২৯; রবিবার ; ২৮ জানুয়ারী ২০২৩

মুরুংদের দুঃসাহসিক অভিযান : প্রেক্ষাপট ১৯৮৫

মমতাজ উদ্দিন আহমদ : ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭:১০

তখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। নিজ পায়ে দাঁড়াতে দেশপ্রেমিক জনতা যখন তৎপর তখন বিষফোঁড়া হিসেবে আবির্ভুত হন পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে কিছু উচ্চাবিলাসী উপজাতীয় নেতা।

এঁরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা জাতি অঞ্চল ঘোষণার দাবী তুলেন। স্বগোত্রীয়দের স্বার্থরক্ষার নামে এঁরা রাতারাতি পরিণত হন খ্যাতির বেহায়া কাঙালে।

১৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ ইং। এদিন কতিপয় দাবী-দাওয়া নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাত করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ। তাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে নিজস্ব আইন পরিষদের অধীনে পরিচালনা ও সংবিধানে তা অর্ন্তভূক্তির দাবী জানান।

কিন্তু একটি সদ্য স্বাধীন দেশে আলাদা জাতি অঞ্চল ও শাসনবিধি পরিকল্পনা প্রত্যাখাত হয়। এর ফলে ২৪ জুন ১৯৭২ সালে গঠিত হয় 'পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি'। যা সংক্ষেপে 'জেএসএস' বলে পরিচিত। পরবর্তী ৬ মাস পর গঠিত হয়ে জেএসএস এর সশস্ত্র শাখা "শান্তি বাহিনী"।

এই শান্তি বাহিনীর সন্ত্রাসের সাথে কখনো আপস করেননি পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র মুরুং উপজাতি। শান্তি বাহিনীর নানা অত্যাচার-অনাচার-দুরাচারের বিরুদ্ধে জীবনবাজি রেখেই প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলে মুরুংরা।

শান্তি বাহিনী গঠনের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য এলাকার পাশপাশি লামা-আলীকদম শান্তি বাহিনীর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। শান্তি বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যা-লুণ্ঠন ও চাঁদাবাজিতে এতদাঞ্চলের পাহাড়ি-বাঙ্গালীরা ভীত-সন্ত্রস্থ থাকত।

১৯৮৫ সাল। আলীকদমের মাতামুহুরী রিজার্ভের কচ্ছইপ্যা মুখের লোংরা পাড়ার ঝিন ঝিরিতে শান্তি বাহিনীর একটি আস্তানা ছিলো। এ আস্তানায় একদিন রাতের দ্বিপ্রহরে আধাঁরে মেনলে মুরুং এর নেতৃত্বে একদল মুরুং দা, কুড়াল, লাঠিসোটা ও গাদা বন্দুক নিয়ে অতর্কিত আক্রমণ চালান।

অস্ত্র হিসেবে ছিল নিজেদের তৈরী গাদা বন্দুক। বন্দুকের একটি আওয়াজে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে যে যার মতো করে পালাতে শুরু করে। এই আক্রমণে নেতৃত্বদানকারী মেনলে মুরুং এর সাক্ষাতকারভিত্তিক একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৯৯ ইং তারিখে রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত 'দৈনিক গিরিদর্পন'-এ। শিরোনাম ছিল 'অনুসন্ধান: আলীকদম ও তৈনছড়ি- ৭"। আলীকদম নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক, লেখক ও সাংবাদিক আতিকুর রহমান এ সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন।

নিচের উদ্বৃতি বিবেচ্য- "আমার অনুসন্ধানের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো মুরুং নেতা বাবু মেনলের সাথে সাক্ষাৎ। আলীকদম সদরেই তার বাসস্থান। তিনি বান্দরবান স্থানীয় সরকার পরিষদের ভূতপূর্ণ সদস্য ও বিদ্রোহী শান্তি বাহিনীর প্রতিরোধকারী মুরুং বাহিনীর সংগঠক ও কমান্ডার। শান্তিবাহিনীর গুলিতে এক পা হারিয়ে পঙ্গু। তবে নিঃসন্দেহে এক সাহসী পুরুষ। শান্তিবাহিনীর প্রতিরোধ ও তার পা হারানোর কাহিনীটি দুঃসাহসী কান্ড।

পড়ন্ত বিকেলে ফিরতি পথে বাস স্ট্যান্ডে অবস্থিত তাঁর বাসাতেই....অল্পক্ষণের আলাপ পরিচয়। তিনি বর্ণনা দিলেনঃ শান্তি বাহিনীর জ্বালায় অতিষ্ট হয়ে শঙ্খ উজানের থানচির বাসস্থান ছেড়ে ১৯৮৩ সালে মাতামুহুরী উজানের আলীকদম অঞ্চলে চলে এলাম।

ধারণা ছিলো এখানে শান্তি পাবো। স্বজাতীয় মুরুংদের প্রধান আবাসস্থল আলীকদম। এই আলীকদমে আমাদের নিজস্ব জনগণ আছে। শান্তিবাহিনীর উৎপাত অসহ্য হলে প্রতিরোধও করা যাবে। কিন্তু আমার ধারণামত এখানেও শান্তি ছিলো না।

শান্তি বাহিনীর উৎপাতে মুরুংসহ সবাই অতিষ্ট ছিলো। স্বজন পরিজন ও স্বজাতীদের সাথে মত বিনিময় শুরু করলাম। মুখ বুজে এভাবে কত সহ্য করা যায়? বুঝতে পারলাম, প্রতিরোধের পক্ষে সাহসী ভূমিকা নিতে অনেকেই প্রস্তুত। কেবল সাংগঠনিক উদ্যোগ দরকার।

আমি লামায় স্বচক্ষে দেখেছি- পোপার তুকরাং মুরুং কারবারীকে শান্তি বাহিনীর ধার্যকৃত মালামাল পৌঁছে দিতে দেরী করায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। থানচিতে আমি দেখেছি ছমদ কাপিতাং নামীয় জনৈক বাঙ্গালী বেপারীকে দিয়ে কবর খুঁড়িয়ে তাকে মেরে ঐ কবরেই মাটি চাপা দেয়া হয়েছে।

তৎপর এই আলীকদমেরই মাতামুহুরী রিজার্ভের মেংরা কার্বারী পাড়ার হতভাগিনী কম্পং মুরুং (স্বামী: লইয় মুরুং) কে গর্ভবতী অবস্থায় হত্যা করে। তার পেট কেটে জীবন্তু শিশুটিকেও টুকরা টুকরা করে কেটে উল্লাস প্রকাশ করেছে শান্তিবাহিনীর নরাধমেরা।

আর সহ্য হচ্ছিলো না। আমি প্রতিরোধে বিশ্বস্ত সঙ্গী-সাথী যোগাড়ে সচেষ্ট হলাম। প্রাথমিকভাবে সহযোগি পেলাম ৭ জন। শান্তিবাহিনীর আরো ৪ জন আমাদের সাথে যোগদানে সম্মত হলেন। শুরু হলো আমাদের শান্তিবাহিনী দমনের নিরস্ত্র অভিযান। ভাবলাম অস্ত্র দরকার। তবে তা শত্রুদের থেকেই কেড়ে নিতে হবে। অস্ত্র ছাড়া অস্ত্রধারীদের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

সে হলো ১৯৮৫ সাল। কাচিপিয়ার (কচ্ছপ্যা) লোংরা (রংরাও) পাড়ার ঝিন ঝিরিতে শান্তি বাহিনীর একটি আস্তানা ছিলো। আমরা গোপনে অনুসন্ধান করে পথঘাট ও আক্রমণের সুযোগ সুবিধা নির্ধারণ করে ওঁৎ পেতে থাকলাম।

আমাদের অস্ত্র হলো দা, কুড়াল, লাঠিসোটা ও গাদা বন্দুক। রাত শেষ প্রায়। অমনি ঝাপিয়ে পড়লাম শান্তিবাহিনীর ঐ আস্তানায়। গাদা বন্দুকের একটি আওয়াজ হলেই শান্তিবাহিনীর সদস্যরা জেগে উঠে যে যেদিকে পারে দিলো ছুট। অল্পক্ষণে সবাই উধাও। আমাদের দখলে এসে গেলো আস্তানাটি।

তাতে পাওয়া গেলো ১টি রাইফেল, ২টি এসএলআর, ১টি এলএমজি ও ৭৫০টি গুলি। আমাদের প্রাথমিক অস্ত্র ভান্ডার গড়ে উঠলো। এই সাফল্যে উৎসাহিত হলেন অনেকে। তাতে আমাদের সদস্য সংখ্যাও বেড়ে গেলো। অনুমান হলো, উক্ত অভিযানকে শান্তিবাহিনী সেনা আক্রমণ বলেই মনে করেছিলো।

কিন্তু পরে তারা নিশ্চিত হয় যে, মুরুংরাই এর হোতা। ফলে মুরুংদের ওপর তাদের উৎপীড়ন বেড়ে যায়। এবং আমরাও তা প্রতিরোধে দৃঢ় সংকল্প হই। আমাদের এই অভিযান ও সাফল্যের কথা পরে সেনা বাহিনীর গোচরীভূত হয় এবং তারা আমাদের সহযোগিতা দান শুরু করে।

আমরা কাপিচিয়া (কচ্ছইপ্যা ঝিরি) অভিযানে অস্ত্র ছাড়াও শান্তিবাহিনীর গুদামজাত করা প্রায় ৫/৬ হাজার মন চাউল পেয়েছিলাম। আমাদের দ্বিতীয় অভিযানক্ষেত্র হলো মধুতে অবস্থিত শান্তিবাহিনীর আস্তানা। আমরা খবর পাই যে, সেখানে এতদাঞ্চলীয় শান্তিবাহিনীর সদস্যরা একটি মিটিং উপলক্ষ্যে সমবেত হয়েছে।

মুরুং বাহিনীর ৯৩ জন সদস্য নিয়ে আমি ঐ এলাকাটি ঘেরাও করে ফেলি। ফলে উভয় দলে সংঘর্ষ হয়। দু'জন শান্তিবাহিনী সদস্য মারা যায় ও বাকিরা পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। এবারও আমরা দু'টি অস্ত্র হস্তগত করি।

এরপর মধু রেংক্রং পাড়ায় শান্তিবাহিনীর সাথে আমাদের তৃতীয় মোকাবেলা হয়। সেখানে আমি নিজে হাতে, পায়ে ও মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হই। আমার দলের অপর একজন যোদ্ধা নিহত হন। তবে শত্রুপক্ষের দু'জন নিহত আর আহতের সংখ্যা অনেক।

আহত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য আমাকে চকরিয়ার মালুমঘাটে অবস্থিত ক্রিশিয়ান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। যেখানে আমার একটি পা কেটে ফেলা হয়েছে। এই কাটা পা-ই বিদ্রোহী ও অত্যাচারী শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে এবং দেশ ও জাতির পক্ষে পরিচালিত আমার সশস্ত্র সংগ্রামের সাক্ষী।

পঙ্গু হলেও এই কাটা পা'র জন্য আমি গর্বিত। তবে আমি অতৃপ্ত এই কারণে যে, শারিরীক অক্ষমতা আমাকে শান্তিবাহিনী দমনে অধিক এগুতে দেয়নি।

সরকার মুরুংদের অবমূল্যায়ন করছে দেখে আমি দুঃখ পাই। চুক্তি অনুযায়ী সরকার পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে মুরুংদের নয়, তাদেরই ক্ষুদ্র শাখা সম্প্রদায় ম্রুদের উপজাতি ঘোষণা করেছেন। অথচ তারা সংখ্যায় শতের কোটায় সীমাবদ্ধ, আর আমরা ২২ হাজারের অধিক। এটা কি জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধ প্রভাবের ফল?

আমরা দেশপ্রেমিক ও বাংলাদেশী জাতির স্বপক্ষ। শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে স্ব-উদ্যোগে পরিচালিত সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা তার প্রমাণ রেখেছি। যদি প্রকৃত চরিত্রের ভিত্তিতে উপজাতি নির্ধারণ করা হয়, তাহলে অন্য অনেকের চেয়ে বাস্তব উপজাতি আমরাই।

আমাদের সরাসরি উপজাতি স্বীকৃতি না দিয়ে ম্রুদের দলে ব্রেকেটভূক্ত করা সঠিক মূল্যায়ন নয়। সরকারের কাছে আমাদের আরো দাবী হলো, আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নেয়া হোক। আমরা এখনো আদিম অনুন্নত মানুষ।

একমাত্র জুম চাষ পেশাই আমাদের জীবিকা নির্বাহের উপায়, যা আজকাল জীবন যাপনের পক্ষে যথেষ্ট নয়। শিক্ষা ও বিভিন্ন পেশাগত যোগ্যতা অর্জিত হলে, আমাদের আদিম জীবন যাপন পদ্ধতি ও জীবিকা নির্বাহে পরিবর্তন আসবে। তাই এখন আমাদের দরকার শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ।

ফল-মূল, গাছ বাগান ও পশু পালনেও আমাদের সহায়তা করা হলে জুম নির্ভরতা কমবে। জুমে এখন আর যথেষ্ট ফল ফসল পাওয়া যায় না। বন-জঙ্গলে গাছপালা আর পশু পাখীর পক্ষেও তা ক্ষতিকর।

বন পশু পাখী আমাদের সম্পদ। বাবু মেনলের সাথে আলাপে মনে হলো, অশিক্ষিত হলেও তিনি একজন চেতনা সম্পন্ন মানুষ। নেতৃত্বের গুণও তাঁর মাঝে আছে। দেখলাম তাঁকে জটলা পাকিয়ে আলাপ ও আড্ডারত একদল মুরুং নারী পুরুষ।

এদের সবাই নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সমস্যার ব্যাপারে পরামর্শ নিতে এসেছে।" মুরুং বাহিনী গঠনের প্রাণপুরুষ মেনলে মুরুং ১৯৫২ সালের ১৯ জুন তারিখে বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের দেওয়াই পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মেনথন মুরুং, মাতার নাম ইয়াপাউ মুরুং। তার স্ত্রীর নাম লেংপাউ মুরুং। তিনি আলীকদম মুরুং কমপ্লেক্সে আমৃতু্ বসবাসরত ছিলেন। বিগত ১৪ ডিসেম্বর ২০০৯ ইং তারিখে তিনি পরলোক গমণ করেন। (তথ্যসূত্র: পার্বত্য চট্টগ্রামের মুরুং উপজাতি, রচনা ও সম্পাদনা মমতাজ উদ্দিন আহমদ, প্রকাশকাল- একুশে বইমেলা ২০১১, প্রান্ত প্রকাশন।)