৭৫২ মিনিট আগের আপডেট; দিন ৬:০১; রবিবার ; ২৮ জানুয়ারী ২০২৩

২৬ সালে পুরোদমে চালু হবে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর

নিজস্ব প্রতিবেদক ২৩ জানুয়ারী ২০২৩, ১৫:৪৩

২০২৬ সালের ডিসেম্বরে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর পুরোদমে চালু হবে। এই বন্দর চালু হলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ থেকে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

বন্দরটি এ অঞ্চলের শিপিং বাণিজ্যের হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। আর এই লক্ষ্য অর্জনে নানা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি গতকাল নির্মাণাধীন মাতারবাড়ি বন্দর এলাকা পরিদর্শন শেষে এই আশাবাদ ব্যক্ত করে।

কমিটির সভাপতি মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের নেতৃত্বে সংসদীয় কমিটি এবং বন্দরের শীর্ষ কর্মকর্তারা গতকাল মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। মাতারবাড়িতে পরিচালিত কার্যক্রমকে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ আখ্যায়িত করে কমিটির সদস্যরা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা না হলে এত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হতো না।

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ বন্দরগুলোতে একাধিক ফিডার সার্ভিস চালুর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোকেও সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে। গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে স্থল, রেল ও নৌপথে পণ্য পরিবহনের কানেক্টিভিটি গড়ে তোলা হচ্ছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে নানা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এম এ লতিফ এমপি, রনজিত কুমার রায় এমপি, আসলাম হোসেন সওদাগর এমপি, এস এম শাহাজাদা এমপি প্রতিনিধিদলে ছিলেন। কমিটির সদস্যরা মাতারবাড়ি পৌঁছালে প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মীর জাহিদ হাসান তাদের স্বাগত জানান। পরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়াল এডমিরাল এম শাহজাহান পুরো প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সংসদীয় কমিটির সদস্যদের কাছে উপস্থাপন করেন।

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী সংকট চলছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করেছেন। যেগুলো এখনই করা দরকার সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার দেয়া একটি প্রকল্প। তাই এই প্রকল্প বাস্তবায়নে তহবিলের কোনো সমস্যা হবে না।

তিনি বলেন, প্রকল্পটিতে করোনার মধ্যেও কাজ হয়েছে। আশা করি, নির্দিষ্ট সময়ের আগে কাজ শেষ হবে। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেললাইন হয়ে গেছে। মাতারবাড়ি বন্দরের সঙ্গে রেললাইন যুক্ত হবে। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কয়লা রাখার জায়গা কাভার্ড এরিয়ায় থাকবে।

বিশ্বের অনেক দেশে সমস্যা আছে। এখানে কোনো সমস্যা হবে না। বন্দরের পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল (পিসিটি) দ্রুত চালুর জন্য মন্ত্রণালয়কে জানাবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান আরো বলেন, মাতারবাড়ি শুধু আমাদেরই নয়, প্রতিবেশীদেরও সেবা দেবে।

ভারত, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সাথে সম্পাদিত নানা চুক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাতারবাড়ি এ অঞ্চলের হাব হিসেবে গড়ে উঠবে। এই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করছি। বিশ্বের মেইন লাইন অপারেটরদের মাতারবাড়ির ব্যাপারে আগেভাগে জানানোর উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

ব্র্যান্ডিং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বে ব্র্যান্ডিং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের বন্দর দিয়ে বাংলাদেশকে রিজিওনাল হাব করতে চাই। বিগ বি ইনিশিয়েটিভের বড় অংশ মাতারবাড়ি। বিশ্বে এক নামে পরিচিত হবে। মাদার ভ্যাসেল আসবে। প্রতিবেশী দেশের বন্দরগুলো এ বন্দরের সেবা পাবে।

তিনি বলেন, রেনাং পোর্টসহ তিনটি দেশের সঙ্গে কোস্টাল শিপিং চুক্তি হয়েছে। ইতালি, ইংল্যান্ড, সাংহাইয়ের সঙ্গে সরাসরি জাহাজ চালু হয়েছে। আরো অনেক পোর্টে সরাসরি জাহাজ চলাচল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর বিশ্বের শিপিং সেক্টরে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরকালে ওই দেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের বিষয়ে বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ বি) ইনিশিয়েটিভ ঘোষণা করা হয়। ওই ঘোষণার প্রেক্ষিতে কঙবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়িতে গ্রহণ করা হয় একটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প।

জাইকার সহযোগিতায় মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নের ১ হাজার ৪১৪ একর জমিতে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। ২০১৮ সাল থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। মাতারবাড়িতে আড়াইশ মিটার প্রস্থ এবং ১৪.৩ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেল তৈরি করা হয়েছে। এই চ্যানেলকে পাশে আরো ১শ মিটার বাড়িয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে বন্দর উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) তৈরি করা ২৫০ মিটার প্রস্থের চ্যানেলকে বন্দর কর্তৃপক্ষ ১০০ মিটার বাড়িয়ে সাড়ে ৩শ মিটারের একটি চ্যানেল তৈরি করার প্রকল্প গ্রহণ করে। ৩৫০ মিটার প্রস্থ ওই চ্যানেলে ৭৬০ মিটার জেটি নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ৪০০ মিটারের একটি জেটিতে কন্টেনার জাহাজ এবং ৩৬০ মিটারের জেটিতে বাল্ক কার্গোবাহী জাহাজ বার্থিং দেয়া হবে। এই বন্দরে ১৬ মিটার থেকে ১৮ মিটার ড্রাফটের ৩০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের জাহাজ বার্থিং দেয়া যাবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়ানো শুরু হয়েছে।