৬৭৯ মিনিট আগের আপডেট; দিন ৪:৪৮; রবিবার ; ২৮ জানুয়ারী ২০২৩

কক্সবাজার-টেকনাফ সাগর তীরের বালিয়াড়ির ১০ ফুট নিচে সুপেয় পানি

আহমদ গিয়াস ঃ ২৪ জানুয়ারী ২০২৩, ১৭:০০

কক্সবাজার শহরের পাশের দ্বীপ সোনাদিয়া। দ্বীপের চারিদিকে সাগরের লবণাক্ত পানি। এই দ্বীপে নেই এক ফোটা মিষ্টি পানির জলাভূমিও। অথচ বিস্ময়করভাবে এখানকার বালিয়াড়ির ১০ ফুট নীচেই পাওয়া যায় সুপেয় মিষ্টি পানি।

আর এই পানি যেন সোনার চেয়েও দামী। একই অবস্থা কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগরতীরে। কিন্তু সাগর তীর থেকে মূল ভূ–খণ্ডের দিকে মাত্র কয়েকশ’ মিটার গেলেই এই স্তরে আর সুপেয় পানি পাওয়া যায় না, পানির জন্য যেতে হয় আরও অনেক গভীরে। আর এই বিস্ময়কর ঘটনার কারণেই কক্সবাজার উপকূলের জনবসতিগুলো এসব ডেইল ঘিরেই গড়ে ওঠে। আর এই ডেইল কেন্দ্রিক লোকালয়গুলো ‘ডেইলপাড়া’ নামে পরিচিতি পায়।

যেমন কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল, কক্সবাজার শহরের ফদনার ডেইল, উখিয়া জালিয়াপালং এর ডেইল পাড়া ও ইমামের ডেইল, টেকনাফের মুন্ডার ডেইল ও সেন্টমার্টিনের ডেইলপাড়া অন্যতম। কিন্তু এসব ডেইল ঘিরে সাম্প্রতিককালে সরকারি–বেসরকারি আরও নানা স্থাপনা গড়ে ওঠায় এখন আর সোনাদিয়া ছাড়া অন্য কোথাও উঁচু ডেইল দেখা যায় না।

তবে সোনাদিয়ার পাশ্চিমপাড়ায় ২০–২৫ ফুট উঁচু কয়েকটি ডেইলই এখন অবশিষ্ট আছে বলে জানান বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন–বাপা জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী। তিনি বলেন, সুপেয় পানির নিশ্চয়তার কারণেই কঙবাজার উপকূলে ডেইলকেন্দ্রিক বহু লোকালয় গড়ে ওঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সাগরতীরের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাপক পরিবর্তনের মাধ্যমে নানা পাকা স্থাপনা গড়ে তোলার কারণে শুষ্ক মৌসুমে ডেইলের নীচে সুপেয় পানির সংকট তৈরি হচ্ছে। ভূ–গর্ভস্থ পানির যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে উপকূলের জমিগুলো বহুবর্ষজীবী জলধারণের ক্ষমতা হারিয়েছে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিদ্যা ও প্রকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকী বলেন, সামুদ্রিক ভারী নোনা জলের পাশে অবস্থিত সাগর তীরের বালুকাময় ডেইলগুলোর নীচে সুপেয় মিষ্টি পানির প্রাপ্যতা প্রকৃতির একটি বিস্ময়কর ঘটনা। সাগর তীরের ডেইলগুলো প্রবাহিত বাতাসের কলাম থেকেই প্রাকৃতিক প্রকৌশলের মাধ্যমে মিষ্টি পানি তৈরি ও মাটির নীচে জমা করে। তাই মিষ্টি পানির মজুদ তৈরিতে এক বিশাল ভূমিকা রাখছে সাগরতীরের বালুর ঢিবিগুলো।

আর ডেইলগুলো উপকূলে প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসাবেও কাজ করছে বলে জানান, বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক ও সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর। তিনি বলেন, ৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ডেইলকেন্দ্রিক লোকালয়গুলো কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিককালে সাগরতীরের ডেইলগুলো ধ্বংস করে ফেলার কারণে ভাঙনের মুখে পড়েছে। সে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। সাম্প্রতিককালে কঙবাজার জেলার উপকূলীয় অঞ্চলে ভাঙন বৃদ্ধির পেছনের কারণ হিসাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সৈকত ও ডেইল রক্ষায় পদক্ষেপহীনতা, ক্ষতিকর আগ্রাসী ও আগন্তুক জাতের গাছের বাগান করা (যেমন অস্ট্রেলিয়ান পাইন বা ঝাউগাছ), ডেইল ভাঙলে সেই ডেইলের প্রতিবেশগত পুনরুদ্ধারে পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো জিও–টিউব বসানো এবং উপকূলের হার্ডেনিং বা পাকাকরণ ব্যবস্থাকে দায়ী করেন সোসাইটি ফর কনজার্ভেশন বায়োলজি’স মেরিন সেকশন এন্ড সোশ্যাল সায়েন্স ওয়ার্কিং গ্রুপ এর বোর্ড মেম্বার ও একলাবের কোস্টাল প্রটেকশন প্রোগ্রামের এডভাইজর কুতুব উদ্দিন আরজু। তিনি বলেন, সৈকত ও ডেইলের উপর বা খুব কাছে নানা পাকা অবকাঠামো যেমন পাকা রাস্তা, কংক্রিটের ব্লক, দেয়াল, বাঁধ, টেট্রাপড বানালে স্থানীয় জাতের উদ্ভিদ ও প্রাণীদের আবাসস্থল নষ্ট হয় এবং সৈকতে বালু জমা হওয়া ও ডেইল তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সাগর–ঘেঁষে এইসব পাকা অবকাঠামো বানানো ও বিদেশি ক্ষতিকর গাছের বাগান করাসহ এইসব কার্যক্রমের পরিণতিতে এই উপকূলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ ডেইল এখন নানা জায়গায় হয় ধ্বংস হয়ে গেছে, নয়তো ধ্বংস হবার পথে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশিয়ানিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নোয়া) গবেষণায় সৈকতের ভাঙন ঠেকানোর জন্য ডেইল ও এর প্রাকৃতিক উদ্ভিদগুলো সংরক্ষণের গুরুত্ব দেয়া হয়। ‘লিভিং শোরলাইনস’ বা জীবন্ত উপকূল নামের এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা পদ্ধতি কেবল সৈকতের ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকায় না, এটি কার্বন কমায়, প্রাণবৈচিত্র্যের আবাস ভূমি হয় এবং সার্বিকভাবে মানুষ ও পরিবেশের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে।