৮৯ মিনিট আগের আপডেট; রাত ২:৩৫; সোমবার ; ২০ মে ২০২৪

জিম্মি দশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরলেন ২৩ নাবিক

মাসুদ পারভেজ, চট্টগ্রাম : ১৫ মে ২০২৪, ১৫:৫০

সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরা বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর ২৩ নাবিকের উচ্ছ্বাস এবং আনন্দাশ্রুতে গতকাল সিক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি)।

বহির্নোঙরের কুতুবদিয়া এলাকায় নোঙর করা আবদুল্লাহর দায়িত্ব নতুন নাবিকদের হাতে দিয়ে জিম্মি দশা থেকে মুক্ত হওয়া নাবিকেরা গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৪টা ১০ মিনিটে এনসিটির এক নম্বর জেটিতে পৌঁছান।

জাহাজটির মালিক প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম গ্রুপের এমভি জাহান মনি–৩ নামের লাইটারেজ জাহাজে চড়ে কুতুবদিয়া থেকে নাবিকেরা চট্টগ্রাম বন্দরে আসেন। জাহাজটি নোঙর করার আগেই নাবিকেরা জাহাজের ডেকে অবস্থান নিয়ে হাত নাড়তে থাকেন। তারা সারিবদ্ধভাবে নিচে নেমে আসেন।

এ সময় কারো কারো হাতে ছিল ছোট জাতীয় পতাকা। উচ্ছ্বসিত এবং আনন্দিত নাবিকদের ঘিরে ধরেন সাংবাদিকরা। কয়েকশ সাংবাদিকের ভিড় ঠেলে তারা ইয়ার্ডে স্থাপিত অস্থায়ী তাঁবুতে পৌঁছান। ওখানে অপেক্ষা করছিলেন তাদের পরিবার পরিজন এবং স্বজনেরা জাহাজ থেকে নেমেই চিফ অফিসার আতিকুল্লাহ খান ছুটে যান দুই মেয়ের কাছে। গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন তিনি।

তিনি বলেন, এই দিনটিরই প্রতীক্ষায় ছিলাম। রাতে–দিনে আল্লাহকে বলেছি, আমি যেন আমার সন্তানদের মুখটি আবার দেখতে পাই। মেয়েদের জন্য বুকটা সারাক্ষণই হু হু করত। পরিবার পরিজনের জন্য হাহাকার করত। আজ স্বজনদের কাছে পেয়েছি, মেয়েদের বুকে নিয়েছি। এর থেকে আনন্দের দিন আমার জীবনে আর কখনো আসেনি। তিন কন্যার বাবা আতিকুল্লাহ খান কন্যাদের কাছে পেয়ে বারবার তাদের বুকে নিচ্ছিলেন। কন্যারাও তাকে ভরিয়ে দিচ্ছিলেন আদরে, চুমুতে। বাবার জন্য নিয়ে যাওয়া ফুল দিয়ে তারাও উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।

সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে আতিকুল্লাহ বলেন, আমরা একটা বীভৎস সময় পার করে আলোয় এসেছি। ১০ বছর বয়সী বড় মেয়ে ইয়াসরা ফাতেমা সাংবাদিকদের বলেন, বাবাকে আর দেখতে পাব না মনে করতাম। কিন্তু আজ বাবাকে পেয়ে খুবই ভালো লাগছে। আমি অনেক আনন্দিত। আমার দাদু এবং আম্মু আব্বুর জন্য অনেক কিছু রান্না করেছে। এখান থেকে আমরা বাসায় গিয়ে অনেক আনন্দ করব। বাবার সাথে বেড়াতে যাব।

নাবিকদের বরণ করতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আয়োজিত অনুষ্ঠানে চিফ অফিসার আতিকুল্লাহর ছোট ভাই আসিফ খান দুই ভাতিজিকে নিয়ে যোগ দেন। দুই বছর বয়সী মেয়ে খাদিজা আরাবিয়া, স্ত্রী ফিরোজা আকতার ও মা শাহনুর বেগম অনুষ্ঠানে যাননি। তারা নন্দনকাননের বাসায় আতিকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

আসিফ খান বলেন, ভাইয়া ফিরে আসায় আজ আমাদের ঈদের দিন। ভাইয়ের জিম্মি দশার তেত্রিশ দিন আমাদের নিকট ছিল ভয়ংকর আতংকের দিন। এবারের ঈদে আমরা কোনো আনন্দ করিনি। আজই আমরা ঈদ করছি। জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার পর আমরা প্রতিটি দিন তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করেছি। আজ আমাদের অপেক্ষার শেষ হলো।

বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুষ্ঠানের পরপরই আতিকুল্লাহ খান দুই মেয়ে ও ছোট ভাইকে নিয়ে নন্দনকাননের বাসায় চলে যান। বাসায় পরিবার পরিজন ছাড়াও আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই অবস্থান করছিলেন বলে জানান আসিফ। আতিকুল্লাহর বাসায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ফিতা কেটে তিনি গৃহে প্রবেশ করেন। ঘরে ঢুকেই তিনি মা শাহনুর বেগমকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। ছোট মেয়েকে কোলে নিয়ে কেক কাটেন। মা শাহনুর আক্তার আতিকুল্লাহকে নিজের হাতে খাবার খাইয়ে দেন। এ সময় তার চোখ থেকে আনন্দাশ্রু ঝরছিল। মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবারও কেঁদে ফেলেন তিনি।

জিম্মি দশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরা নাবিক নুর উদ্দীনকে বরণ করতে বন্দরে এসেছিলেন তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। সাথে ছিল আড়াই বছর বয়সী পুত্র সাদমান নুর। নাবিকদের ফুল দিয়ে বরণ করার পর নুর উদ্দীনকে কাছে পেয়ে আবার ফুল দিয়ে বরণ করেন তার স্ত্রী। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে স্ত্রী জান্নাতুল সাদমানকে বাবার কোলে তুলে দেন। একমাত্র পুত্রকে কোলে নিয়ে কেঁদে ফেলেন নুর উদ্দীন। আড়াই বছরের ছেলে সাদমানও বাবার বুকে মাথা এলিয়ে চুপ করে থাকে, ক্ষণে ক্ষণে দেখতে থাকে বাবার মুখ। নুর উদ্দীন কথা বলতে পারছিলেন না, শুধু কাঁদছিলেন।

পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রথম যেদিন জলদস্যুরা আমাদের জাহাজ আটকে ফেলে সেদিন মনে মনে ভেবেছিলাম, এই বুঝি আমাদের জীবনের শেষ সময়। আর হয়ত দেশে ফেরা হবে না। আর হয়ত ছেলের মুখ দেখতে পারব না। কিন্তু আল্লাহর অসীম রহমতে আমি স্ত্রী–সন্তানের মুখ দেখলাম। বাড়িতে গিয়ে মায়ের মুখ দেখব। জিম্মি দশার ৩৩ দিন সম্পর্কে বলতে গিয়ে নুর উদ্দীন বলেন, জলদস্যুরা আমাদেরকে জিম্মি করে রেখেছিল। তবে কখনো মারধর বা খুব বেশি খারাপ ব্যবহার করেনি। নানাভাবে ভয় দেখাত। আশেপাশে কোনো জাহাজ দেখলেই তারা আমাদেরকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখত। তখন প্রচণ্ড ভয় পেতাম। মনে হতো, এই বুঝি বুলেটে বুক ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। আজ দেশে ফিরে মনে হচ্ছে, ওসব বুঝি কোনো দুঃস্বপ্ন ছিল।

এমভি আবদুল্লাহর নাবিক এমডি নাজমুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এভাবে দেশে ফিরতে পারব তা আমাদের ভাবনা থেকে চলে গিয়েছিল। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখত। ফোন করতে দিত না। নানাভাবে ভয় দেখাত। তবে কখনো মারধর করেনি। তিনি বলেন, আমরা এত দ্রুত মুক্তি পাব তা স্বপ্নেও ভাবিনি। আশেপাশে আন্তর্জাতিক বাহিনীর জাহাজ দেখলে দস্যুরা আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করত। গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিত। তখন মনে হতো এই বুঝি জীবন শেষ হয়ে গেল। পরিবার পরিজনের জন্য বুকটা হু হু করত। প্রচুর কেঁদেছি। জীবনে এমন একটি দিন আসবে তা মনে হতো না। আজ দেশে ফিরে মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি আমরা ভয়ংকর একটা পথ পাড়ি দিয়ে জীবন হাতে নিয়ে দেশে ফিরেছি।