৬৭০ মিনিট আগের আপডেট; দিন ১০:৩১; শুক্রবার ; ১২ ডিসেম্বর ২০১৯

শেখ মুজিব, প্রথম দেখার স্মৃতি

নির্মলেন্দু গুণ ২২ নভেম্বর ২০১৯, ১৪:৪৫

আজ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হওয়ার গল্পটি তোমাদের শোনাব।

১৯৬৪ সালের কোনো একদিন তাঁকে আমি প্রথম দেখি। অনেকের সঙ্গে কথা বলে শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার ট্রেনে দেখা হওয়ার তারিখটি মনে হয় নির্দিষ্ট করতে পেরেছি—৮ নভেম্বর ১৯৬৪।

১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচনটি ছিল পাকিস্তানের লৌহমানব প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল মুহম্মদ আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসির নির্বাচন। পাকিস্তানের দুই অংশের ৪০+৪০ হাজার ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটার ছিলেন।

১৯৬৪ সালের ২৬ জুলাই শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সম্মিলিত বিরোধী দল (কমবাইন্ড অপজিশন পার্টি–কপ) গঠিত হয়। ওই দলের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আপন ভগিনী মোহতারেমা ফাতেমা জিন্নাহ। ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে এবং আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যেই শেখ মুজিব তখন দেশব্যাপী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন।

আমি তখন ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে পড়ি। নেত্রকোনা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি (বিজ্ঞান) পাস করার পরও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাজনিত প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হতে পেরে আমি ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ফিরে আসি এবং বিএসসি পাস কোর্সে ভর্তি হতে বাধ্য হই।

১৯৬৪ সালে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করে পাস কোর্সে বিএসসিতে আমি ছাড়া আর কেউ কোথাও ভর্তি হয়েছিল বলে আমার মনে হয় না। ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ভালো সাবজেক্টে অনার্স নিয়ে ভর্তি হতে না পারায় আমার মন ভেঙে যায়। আনন্দমোহনে ভর্তি হয়েছি বটে, কিন্তু পড়াশোনায় মন বসে না।

একটা হতাশা এসে আমার জীবনের সকল স্বপ্নকে গ্রাস করে। তাই ছুটিছাটায় গ্রামের বাড়িতে এলে আর ময়মনসিংহে যেতে চাই না। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ আমাকে টানে না। আমি গ্রামের বাড়িতে সময় কাটাই। সকালের ট্রেনে নেত্রকোনা শহরে চলে যাই। সেখানে উত্তর আকাশ পত্রিকার কার্যালয় সিদ্দিক প্রেসে বসি। নেত্রকোনার কবিবন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাই। দুপুরে কোথাও কোনো ছোট হোটেলে খেয়ে সন্ধ্যার ট্রেনে বারহাট্টায় ফিরে আসি।

আমার ওই দুঃসময়ের কথা আমি নিজের আত্মজীবনী আমার কণ্ঠস্বর–এ বিস্তারিত লিখেছি, মহাজীবনের কাব্য গ্রন্থটিতেও এটি রয়েছে।

কবিতা আমি অবসরে লিখতাম বটে, কিন্তু কবি হওয়ার কোনো বাসনা ছিল না। কবি যে হওয়ার বিষয়, চেষ্টা করলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারদের মতো কবিও হওয়া যায়, তেমন কোনো ধারণাও আমার ছিল না। তবে পড়ালেখায় ছেদ পড়ার পর এক অখণ্ড শূন্যতার মুখে পড়ে মনে হলো, এই সব জাগতিক-একাডেমিক যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি লাভের একটা কঠিন চীবরদানের মতো দিব্যপথ খুলে দিতে পারে কবিতা। আমার একাডেমিক শিক্ষা সুসম্পন্ন করার মাধ্যমে আত্মপ্রতিষ্ঠার পারিবারিক পরিকল্পনাটি ভেস্তে গেলে আমি একটা মুক্ত স্বাধীন জীবন লাভ করি।

১৯৬৪ সালটি হয়ে ওঠে আমার জীবনের একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট। আমার কাছে কবিতা হয়ে ওঠে ‘নেশা, পেশা ও প্রতিশোধ গ্রহণের হিরন্ময় হাতিয়ার।’

ঠিক ওই (সুবর্ণ?) সময়টিতেই পূর্ব বাংলার উদীয়মান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার দেখা হয়, রবীন্দ্রনাথের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতার মতো।

বঙ্গবন্ধু তখনো ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে পরিচিত হননি, শেখ মুজিব নামেই তিনি তখন দেশব্যাপী পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘদেহী এ রকম সুদর্শন পুরুষ তখন পূর্ব পাকিস্তানে আর কেউ ছিলেন না। পত্রিকায় তাঁর ছবি আমি দেখেছি, কিন্তু কাছ থেকে তাঁকে কখনো দেখিনি। দেখার সুযোগ পাইনি।

ময়মনসিংহের সার্কিট হাউসের মাঠের জনসভায় পাকিস্তানের লৌহমানব প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে দূর থেকে দেখেছি। ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ভিড়ের মধ্যে করমর্দন করার সুযোগ পেয়েছি। আইয়ুব খানের প্রিয়, আস্থাভাজন ছিলেন ময়মনসিংহের মোনায়েম খান। আইয়ুব খান তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর বানিয়েছিলেন। মোনায়েম খানকেও দূর থেকে দেখেছি।

আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত সৈয়দ নজরুল ইসলামকেও দেখেছি দূর থেকে। আর কোনো জাতীয় নেতাকে দেখিনি।

শেখ মুজিবকে দেখার খুব সাধ ছিল আমার। কিন্তু আমার সেই সাধ মেটানোর কোনো সুযোগ পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ করেই একদিন সেই সুযোগ এসে গেল।

আমাদের কলেজের খুব কাছেই নেত্রকোনা রেলস্টেশন। ওই রেলস্টেশনের ভেতরে একটা চায়ের স্টল ছিল। ওই স্টলে আমরা চা খেতাম এবং দল বেঁধে আড্ডা দিতাম। পরে ময়মনসিংহ থেকে মোহনগঞ্জগামী ট্রেন এলে বিনা টিকিটে ওই ট্রেনে চড়ে বীরদর্পে বারহাট্টায় ফিরতাম।

একদিন চায়ের স্টলে বসে জানতে পারি, আমরা যে ট্রেনের অপেক্ষায় আছি, দুপুরের সেই ট্রেনে করে শেখ মুজিব আসছেন। তিনি মোহনগঞ্জে যাবেন। সেখানে তিনি আইয়ুববিরোধী একটি জনসভায় ভাষণ দেবেন।

একেই বলে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। আমার খুবই আনন্দ হলো প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে এবার খুব কাছ থেকে দেখতে পাব ভেবে। শেখ মুজিবকে একনজর দেখার জন্য প্রচুর লোকজন এসে জড়ো হলো রেলস্টেশনে।

যথাসময়ের বেশ কিছু পর স্টেশনে এসে পৌঁছাল সেই ট্রেনটি, যার কোনো একটি কামরার মধ্যে রয়েছেন শেখ মুজিব। ট্রেনটি স্টেশনে থামতে না–থামতেই লোকজন ছুটে গেল শেখ মুজিব ও তাঁর সঙ্গীদের বহনকারী কামরাটির দিকে। আমিও ছুটলাম। কিন্তু ভিড় ঠেলে তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারলাম না। ট্রেন ছেড়ে দিল।

আমি ভিড় ঠেলে ওই কামরার হাতল ধরে ঝুলে পড়লাম।

যা থাকে কপালে। শেখ মুজিবকে ছাড়া যাবে না।

শেখ মুজিবের প্রতি আমার মধ্যে সৃষ্ট ভালোবাসা ও আস্থার কারণ আমি আমার আত্মজীবনী আমার কণ্ঠস্বর বইয়ে লিখেছি।

এই প্রথম এমন নেতাকে দেখতে পাই, যিনি রবীন্দ্রনাথকে শ্রেষ্ঠজ্ঞানে শ্রদ্ধা করেন। তাঁর পোশাক, তাঁর ভাষা, তাঁর উচ্চারণ খাঁটি বাঙালির। তাঁর দিকে তাকিয়ে তাঁকে শুধুই মুসলমানদের নেতা বলে আমার মনে হয় না। মনে হয় তিনি হিন্দু–মুসলমাননির্বিশেষে সকল বাঙালির নেতা। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি বজ্রনিনাদে ঢাকার রাজপথে নেমে আসেন। ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ লেখা বিরাট ফেস্টুন নিয়ে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত করেন (১৯৬৪–এর ৫, ১১ মার্চ শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটিও গঠিত হয়)।

ভারতের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে তিনি সস্তায় মাঠ গরম করার রাজনীতি করেন না। তিনি সুদর্শন এবং কবিতাপ্রেমী নেতা। এ রকম কোনো নেতা আমি আগে কখনো দেখিনি। পত্রিকায় তাঁর ছবি দেখেছি, কিন্তু কাছ থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ আমার হয়নি। তাই তিনি ট্রেনের যে কামরায় ছিলেন, আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই কামরার হাতল ধরে ঝুলে পড়েছিলাম। আমার মতো মুজিবপাগল তখন আরও ছিল। তারাও আমার সঙ্গে ওই কামরার হাতল ধরে ঝুলছিল। যাঁকে একনজর দেখার জন্য আমাদের ঝুঁকি নেওয়া, তিনি তা বুঝতে পারলেন এবং কামরার ভেতরে থাকা ভলান্টিয়ারদের বললেন, ‘তোমরা দরজাটা খুলে দাও, ছেলেগুলো তো অ্যাকসিডেন্ট করবে।’

তাঁর নির্দেশে তখন দরজাটি খুলে দেওয়া হলো। আমরা কামরার ভেতরে প্রবেশ করে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। খুশি হলাম শেখ মুজিবের আচরণে। তিনি তো আমাদের সম্পর্কে উদাসীনও থাকতে পারতেন, যেমন ছিলেন তাঁর অন্য ভ্রমণসঙ্গীরা। শেখ মুজিব জানতেন, তাঁর রেল-কামরার হাতল ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঝুলে থাকা ছেলেগুলো তাঁকে কাছে থেকে একটু দেখার জন্যই এ রকম পাগলামি করছে।

আমার হাতে ছিল একটি চরকা বড়শির ছিপ। আমি তখন চরকা বড়শি দিয়ে মাছ মারতাম। আমার পুরোনো ছিপটি বড় মাছ ধরার উপযুক্ত ছিল না। তাই একটি নতুন মজবুত ছিপ কিনতেই সেদিন বারহাট্টা থেকে নেত্রকোনায় এসেছিলাম।

শেখ মুজিবের সুন্দর মুখশ্রী দর্শনের আনন্দ নিয়ে আমি যখন এ রকম ভাবছিলাম, তখন কী আশ্চর্য, শেখ মুজিবের চোখ পড়ল আমার ওপর। তিনি আমার চোখে চোখ রেখে, আমার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে আমাকে কাছে ডাকলেন। বললেন, ‘এই ছিপওয়ালা ছেলে, এদিকে এসো।’

আমি অবাক হলাম। তিনি আবার আমার মনের ভাবনা জেনে গেলেন না তো?

বড়শির ছিপটি নিয়ে শুরু থেকেই আমি বেশ বিব্রত বোধ করছিলাম।

কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। আমার বেলায় কি তা–ই সত্য হলো? তিনি কি বড়শির ছিপ নিয়ে তাঁর কামরায় প্রবেশ করার জন্য আমাকে ভর্ৎসনা করবেন? কে জানে? আমার বড়শির ছিপটি আমি আমার পাশে দাঁড়ানো একজনকে দিয়ে বললাম, আমার ছিপটা একটু রাখেন।

সে রাখল আমার ছিপটি। বলল, ‘যান।’ আমি তখন কিছুটা নির্ভার বোধ করে শেখ মুজিবের দিকে এগিয়ে গেলাম।

তখন শেখ মুজিব আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আরে, তোমার ছিপটি নিয়ে আসো। তোমাকে তো ওই ছিপটার জন্যই ডাকলাম। ওটা নিয়ে আসো। দেখি তোমার ছিপটা কেমন।’

আমি খুব লজ্জা পেলাম। ছিপটা নিয়ে আমি এগিয়ে গেলাম শেখ মুজিবের কাছে।

তিনি আমার হাত থেকে ছিপটা নিজের হাতে তুলে নিলেন। ছিপটায় হাত বুলিয়ে, একটু নেড়েচেড়ে বললেন, ‘তুমি তো বেশ ভালো শিকারি হে।

চমৎকার ছিপ কিনেছ।’

‘মাছ মারো খুব?’

আমি বললাম, ‘জি স্যার। খুব না হলেও মারি।’

তিনি হাসলেন। ট্রেনের কামরাটাকে একটা জলাশয় বানিয়ে তিনি ছিপ দিয়ে মাছ ধরার একটা চমৎকার ভঙ্গি করলেন।

শেখ মুজিবের পাশে আওয়ামী লীগের নেতারা ছিলেন। সবার নাম বলতে পারব না। আমার মনে হয়, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও মোশতাক ছিলেন। শেখ মুজিবের কাণ্ড দেখে তাঁরা খুব হাসছিলেন। কামরার সবাই খুব আনন্দ পাচ্ছিল।

তিনি তাঁর সঙ্গীদের বললেন, আমার একসময় চরকা বড়শিতে মাছ মারার খুব নেশা ছিল। কিন্তু আমার ধৈর্য একটু কম। আর সময়ও নষ্ট হয় খুব।

পাইপের নিভে যাওয়া তামাকে আগুন ধরিয়ে একটা দীর্ঘ সুখটান দিয়ে তিনি একটা গল্প শোনালেন তাঁর ভ্রমণসঙ্গীদের উদ্দেশ করে। সেই সুযোগে আমরা যারা মাঝপথে তাঁর কামরায় উঠেছি, তারাও শুনতে পেলাম গল্পটা।

তিনি বললেন, ‘একদিন ধানমন্ডি লেকে মাছ ধরতে বসে ছিলাম। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল, কিন্তু মাছের দেখা নেই। আমার জেদ চেপে গেল। ঠিক করলাম, আজ মাছ না নিয়ে ঘরে ফিরব না। যা থাকে কপালে। সন্ধ্যার দিকে ফ্লাস্কভর্তি চা এবং কিছু ভুনা খিচুড়ি নিয়ে কামালের মা এসে হাজির হলো। ভেবেছিলাম আমার ওপর রাগ করেছে। পরে দেখলাম, না, রাগ করে নাই। আমি খুব খুশি হয়ে তাকে ধন্যবাদ দিলাম।

‘তখন কামালের মা আমাকে বুঝায়া বলল, “শোনো, তুমি এই অভ্যাসটা বাদ দেও। তোমার রাজনীতির জন্য এইডা ক্ষতিকর। নেতা–কর্মীরা তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য, কথা বলার জন্য বসে থাকে। আমি তো তাদের চায়ের বেশি কিছু দিতে পারি না। তারা কষ্ট পায়। ভয়ে তোমারে কিছু বলতে পারে না।”

‘আমি মানলাম রেনুর কথা।

‘সেই যে মাছ মারা ছাড়লাম,
আর ধানমন্ডির লেকে যাই না। অনেক দিন পর আইজ আবার চরকা
বড়শির ছিপ হাতে নিলাম। বড় ভালো লাগল।’

যে ছিপটি নিয়ে আমি বিব্রত ও সংকুচিত বোধ করছিলাম, সেই ছিপটাই শেখ মুজিবসহ সকলের আনন্দের উৎস হয়ে উঠেছে দেখে আমি খুবই গর্বিত বোধ করছিলাম। আর মনে মনে চাইছিলাম, শেখ মুজিব যেন আমার নামটা জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই আমার নাম জানতে
চাইছিলেন না।

কিছুক্ষণ পর, আমি যখন আমার বড়শির ছিপটি নিয়ে ফিরে আসছিলাম, তখন তিনি যেন আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন। বললেন, ‘তোমার নামটা তো জানা হলো না।’

যতটা সম্ভব শুদ্ধ উচ্চারণে আমি তখন আমার নামটা বললাম।

তিনি আমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বললেন, ‘তোমার বাড়ি কোথায়?’

আমি বললাম, ‘বারহাট্টা।’

তিনি চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবলেন। তারপর চোখ খুলে বললেন, ‘জগদীশ। জগদীশ চক্রবর্তী। ওর বাড়ি ছিল বারহাট্টা। তাকে চেনো? সে এখন কোথায় আছে, জানো?’

আমি বললাম, ‘জি স্যার। আমার বাবার মুখে ওনার নাম শুনেছি। উনি কলকাতায় আছেন। হাওড়ার ডিস্ট্রিক্ট জজ।’

শেখ মুজিব স্মৃতি রোমন্থন করে বললেন, ‘ও খুব ভালো ছাত্র ছিল।’

আমি কী করি, তিনি আর তা জানতে চাইলেন না।

আমিও আগ বাড়িয়ে বলতে পারলাম না যে আমি একজন কবি, কবিতা লিখি।

ট্রেন বারহাট্টায় এসে গেল। আওয়ামী লীগের বেশ কিছু কর্মী জড়ো হয়েছিল বারহাট্টা রেলস্টেশনে। আমরা ট্রেন থেকে নেমে গেলে শেখ মুজিব দরজায় দাঁড়িয়ে কর্মীদের উদ্দেশে কিছু বললেন। বললেন, ‘পাকিস্তানের স্বৈরাচার প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে। ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে কাজ করেন। আগামী নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহই আমাদের সম্মিলিত বিরোধী দলের মনোনীত প্রার্থী।’

ট্রেন ছেড়ে দিল। তখনো ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি তৈরি হয়নি।

যত দূর মনে পড়ে, বারহাট্টার মানুষ ‘শেখ মুজিব জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিয়েই সেদিন তাঁকে বিদায় জানিয়েছিল।


সর্বমোট পাঠক সংখ্যা : ৫৫