২০৫ মিনিট আগের আপডেট; রাত ৮:১০; রবিবার ; ১৯ জানুয়ারী ২০২০

যে হৃদয়ে কোরআন থাকে

অনলাইন ডেস্ক: ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৩০

আমরা কি প্রতিদিন পবিত্র কোরআন অর্থসহ পড়ি? নাকি অন্যের আলোচনা শুনে বিতর্কে লিপ্ত হই? কোনটিতে অভ্যস্ত আমরা? পরনির্ভরশীল মানুষ কখনও উন্নত চিন্তা করতে পারে না। অন্যের আলোচনা, অন্যের বক্তব্য শুনে শুনেই যার দিন পার হয়, সে এক রকম বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হয়ে যায়। যার মস্তিষ্কজুড়ে কেবল একপেশে চিন্তা ঘুরপাক খায়।

তিনি কী বলছে, তার বক্তব্য এমন কেন? না তিনি এটা বলতে পারেন না! এসব বুলি আওড়াতে আওড়াতেই অনেকের সময় পার হয়। আজকাল বিতর্কই যেন ‘ইসলামের সেবা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে! এ বিতর্ক থেকে ফেসবুকও পিছিয়ে নেই। ফেসবুকেও একে অন্যকে ঘায়েল করতে উঠে পড়ে লেগেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলেন আর চায়ের দোকান বলেন সবখানেই এসব আলোচনা চলছে!

আমাদের হৃদয় থেকে সহানুভূতি, সহমর্মিতা উঠে গেছে। একটু চুপ থাকা, শান্তভাবে চিন্তা করা, ঝগড়াঝাটি যাতে না বাড়ে সে পথ অবলম্বন করা, এসব শুদ্ধ চর্চা আর আজকাল হচ্ছে না। কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা, বিভাজন সৃষ্টির কৌশল করা, উসকানিমূলক আলোচনা করা এসব করলেই মনে হয়, বড় কিছু (!) করে ফেলছি।

আজকের প্রজন্ম ‘পড়ার চেয়ে শোনে বেশি’ এ ধারায় চলছে। অথচ পবিত্র কোরআন বলছে, ‘পড়। পড় তোমার প্রভুর নামে; যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’

মানুষ যখনই পবিত্র কোরআন অর্থসহ পড়া ছেড়ে দিল, তখনই সে হয়ে উঠল অন্যের ভৃত্য। আর ভৃত্য কখনও স্বাধীন চিন্তা করতে পারে না। সে দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় অন্যের গোলামি করে। জাতি হিসেবে এ ব্যর্থতাই এখন চরম আকার ধারণ করছে।

শীতের রাতগুলোতে বাংলার আনাচে-কানাচে ইসলামী অনুষ্ঠানগুলো সরব হয়ে ওঠে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এ অনুষ্ঠানগুলোতে খুব কম সংখ্যক আলোচকই বর্তমান পরিস্থিতি কিংবা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করে থাকেন। অধিকাংশ বক্তা আলোচনায় এমন বিষয় অবতারণা করেন, যাতে কোরআনের সহজ-সরল ব্যাখ্যা ছেড়ে যুক্তিতর্ক দিয়ে উপস্থাপনা করেন, যা মানুষের সহজ-সরল মনে বিপত্তি ঘটায়।

ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী দলগুলোয় মৌলিক দুটি ধারা চলে আসছে। একটি সুফি বা পীরপন্থী, অন্যটি ওহাবিপন্থী। প্রয়োজন সাপেক্ষে এ দুটি ধারা এখানে তৈরি হয়েছে। যখন যেটার আবেদন ছিল, সেটাই আপন গুণে সরব হয়ে উঠেছে। এ দেশে ইসলামের আগমন এবং ফরায়েজি আন্দোলন কিংবা বাঁশের কেল্লা নির্মাণ তারই প্রমাণ বহন করে। ইসলামের জন্য দুটি ধারাই কম-বেশি কাজ করেছে। তাদের মাঝে ভুল-ভ্রান্তি কম-বেশি ছিল বলতে হবে।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে, এ দুটি ধারা কখনও একে-অন্যের আপন হতে পারল না!

যখনই হিংসা, বিদ্বেষ, শ্রেষ্ঠত্ব এ শব্দগুলো কোনো দলের ভেতরে প্রবেশ করেছে, তখনই অন্য দলের মতামত সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়েছে, যা আজ অবধি সুরাহা হয়নি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘বাংলার অশিক্ষিত মুসলমানরা গোঁড়া এবং শিক্ষিত মুসলমানরা ঈর্ষাপরায়ণ।’ নজরুলের ভাষায়, ঈর্ষাপরায়ণের কারণেই কেউ কাউকে সহ্য করতে পারেনি।

আমাদের প্রজন্ম কিংবা পরবর্তী যে প্রজন্ম গড়ে উঠছে তা অন্ধ, বোবা, বধির ছাড়া আর কিছুই নয়। স্বাভাবিক মানবিক গুণাগুণ তৈরি থেকেও তারা দূরে অবস্থান করছে। তারা সুন্দর সমাজ গড়ার পথ থেকে দূরে সরছে। আমরা দলের কর্মীদের কেবল যুক্তিতর্ক কিংবা অন্য দলের যুক্তি খণ্ডনের বই পড়াতে পড়াতেই নাভিশ্বাস তুলে ফেলছি। শুধু তা-ই নয়, পবিত্র কোরআনের শুরু থেকে শেষ অবধি প্রতিটি সূরা অর্থসহ না পড়িয়ে, সুবিধামতো আয়াত খুঁজে খুঁজে পড়াচ্ছি। এবং তার পক্ষে নিজস্ব মতবাদের ব্যাখ্যা পড়াচ্ছি, যা একজন মানুষকে অন্ধ বা দালালি করতে সাহায্য করছে।

আমরা জানি, সাহাবায়ে কেরামরা পবিত্র কোরআনের যখন যে-ই অংশ অবতীর্ণ হতো তখন সেই অংশ আয়ত্ত করতে সবসময় সরব থাকতেন এবং আমল করতেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে সুন্দর একটি সমাজ উপহার দিয়েছিলেন; কিন্তু আজ আমরা এত মতবাদের বই পড়তে পড়তে মূল থেকেই সরে যাচ্ছি। কোরআন-হাদিসের আসল শিক্ষা থেকেই দূরে চলে যাচ্ছি!

পবিত্র কোরআন এবং রাসূল (সা.)-এর হাদিস কেউ যদি একটু সময় নিয়ে শুরু থেকে শেষ অবধি অর্থসহ বুঝে বুঝে পড়ার চেষ্টা করে, (আল্লাহর রহমতে) সে কখনও দলান্ধ কিংবা গোঁড়া হবে না। সে হবে উদার, মননশীল এবং সাচ্চা মুসলমান ও সঠিক মানুষ।

হাদিস শরিফে রাসূল (সা.) কী সুন্দর একটি বাণী উপহার দিয়েছিলেন। আর তা হচ্ছে, ‘প্রকৃত মুসলমান সেই, যার মুখ, হাত থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ।

আমরা যেন আল্লাহর কালাম এবং রাসূল (সা.) এর বাণী অনুযায়ী জীবন অতিবাহিত করতে পারি, সে তৃষ্ণা বুকে পোষণ করি। তাহলেই আমরা দলের ঊর্ধ্বে উঠে কোরআন ও সুন্নার আলোয় জীবন গড়তে পারব।


সর্বমোট পাঠক সংখ্যা : ৬০