৬৯৪ মিনিট আগের আপডেট; দিন ৯:১৭; মঙ্গলবার ; ০৬ জুলাই ২০২০

ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোকে নতুন আকৃতি দিচ্ছে করোনাভাইরাস

মারিহা আক্তার ১৯ জুন ২০২০, ২১:১৩

বিশ্ব মহামারী কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস মানুষে মানুষে সম্পর্কের নতুন মাত্রা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। হাতে গোনা কিছু মানুষের খুব কাছাকাছি অবস্থান, অন্যদিকে কিছু মানুষের কাছ থেকে একেবারেই দূরে রেখে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটাচ্ছে করোনাভাইরাস। যেমন কাছের সঙ্গী কিংবা পরিবারের সদস্যদের সাথে প্রতিনিয়ত নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠার ইতিবাচক পরিবেশ তৈরী করে দিয়েছে লকডাউন, অপরপক্ষে বন্ধুবান্ধব সহ সমাজের বৃহৎ অংশের সাথে দীর্ঘদিন যোগাযোগ বন্ধ করছে।

মূলত এ ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীন যেখানে ভাইরাসটি সংক্রমণের প্রথম দিকেই পুরো দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করা হয় এবং হংকং এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা থেকে শুরু করে কর্মীদের ঘরে অবস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘদিনের ব্যবধানে ভাইরাসটি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে এনে চীনে এখন কিছুটা স্বস্তির আভাস মিলছে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশে স্বস্তি নেই। চীনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া শুরু হলেও এই মহামারী পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন বয়ে আনছে।অর্থনৈতিক দুরাবস্থা গৃহবন্দী জীবনের অভিশাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়ে বৈবাহিক জীবনে চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করছে- এমনটাই মনে করছেন হংকং এর চাইনিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী সুসেন চোই।

বিশেষ করে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা বেশি লক্ষণীয়। চীনের উত্তরাংশের শানসি প্রদেশের বিবাহ নিবন্ধন অফিসগুলো মার্চে পুনরায় খোলার পর পরই নজিরবিহীন বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা প্রত্যক্ষ করছে। "শিয়ান বিবাহ বিচ্ছেদ বিস্তার " শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ ঘটনাটি ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। মহামারী চলাকালীন সময়ে তিনি চীনের উহান প্রদেশের একটি হাসপাতালে সেবিকা হিসেবে কাজ করতেন। পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্ত্রীর উপর ছেড়ে দিয়ে তার স্বামী কর্মহীন অবস্থায় পাঁচ বছরের এক সন্তানকে নিয়ে বাসায় অবস্থান করেন এবং আশেপাশে কোনো কাজ খুঁজতেও অনীহা প্রকাশ করেন। এ অবস্থায় তার স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মূলত ২০০৩ সাল থেকে চীনে বিবাহ বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার দরুণ এটির হার দিন দিন বেড়ে চলছে।' উইচ্যাট ' নামের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডিভোর্সের অ্যাপোয়েনমেন্ট নেওয়া যাচ্ছে, ফলে বিষয়টি এখন আরও সহজ হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪ . ১৫ মিলিয়ন যুগল বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পারিবারিক সহিংসতাজনিত সমস্যা না থাকলে বৈবাহিক যুগলকে বিচ্ছেদের আগে অন্তত ৩০ দিন চিন্তা ভাবনা করার এক নতুন নিয়ম চালু করে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা ২০২১ সাল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মহামারীর ফলে লকডাউন ঘরোয়া সহিংসতা বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। চীনের হুবেই প্রদেশে এ মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে সেখানে পারিবারিক অশান্তি প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশেগুলোতে যেখানে লকডাউন কার্যকর হয়েছে সেসব জায়গাতেও একই ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে।

বেইজিং এ নারীর অধিকার ও সমতা সংক্রান্ত বেসরকারি সংস্থা জানিয়েছে, করোনা ভাইরাসজনিত গৃহবন্দী অবস্থার শুরু থেকেই হেল্পলাইনে কলের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এগুলো বেশিরভাগই ঘরোয়া সমস্যাজনিত। হংকং এর হারমনি হাউজে একটি ঘরোয়া সহিংসতা প্রতিরোধ সেন্টার চালু হয়েছে যেখানে মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে ক্রমাগত ভুক্তভোগীদের সংখ্যা বাড়ছে।করোনাভাইরাস শুরুর আগে থেকেই নির্যাতনের শিকার পিংপিং নামের এক নারী সম্প্রতি এই প্রতিরোধ সেন্টারে অবস্থান করছেন। তার ভাষ্যমতে, মহামারীর এ সময়ে তার স্বামীর গৃহে অবস্থান তার জন্য ভিন্ন সমস্যার সূচনা করেছে।গৃহের পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় নিয়েও তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগেই আছে।এমনকি শারীরিক নির্যাতন থেকেও তিনি রেহায় পাচ্ছেন না। হারমনি হাউজের কার্যনির্বাহী সুসানা লামের মতে, হংকং পুরোপুরি লকডাউনের মধ্য দিয়ে না গেলেও অবিরত গৃহে অবস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবার দরুণ পারিবারিক সমস্যা বেড়েই চলছে!

একটি নতুন বিশ্ব:

শুধু নির্যাতন কিংবা ঘরোয়া সহিংসতা নয়, আরও বেশ কিছু বিষয় বর্তমানে পরিবারগুলোকে চিন্তার মুখোমুখি করেছে। হংকং এর একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট শারমিন শ্রোফের মতে, সামাজিক দূরত্ব কার্যকর, ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে অভিভাবকরা বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পড়ে যাচ্ছেন।পাশাপাশি চীনে বর্তমানে পরিবারের সব সদস্যদের গৃহে অবস্থানের ফলে সেবাযত্নের একটি বাড়তি চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যার বেশিরভাগই অন্যান্য সময়ের মতোই নারীদের উপর পড়ছে। চই এর মতে, এ মহামারী নারীদের উপর অস্বাভাবিক প্রভাব বয়ে আনবে, যার ফলে তারা পেশাগত জীবনে কর্মহীন হওয়ার পাশাপাশি গৃহের কাজকর্মের বাড়তি চাপের সম্মুখীন হবে।

এটা সত্য যে, কর্মহীন বেকার জীবনযাপনের দরুণ পুরুষেরা অর্থনৈতিক চাপের কবলে পড়ছে, অন্যদিকে নারীরাও ঘরে বাইরে নানা ধরণের পীড়নের শিকার হচ্ছে। এরকম একটা ঘটনার উদাহরণ প্রত্যক্ষ করা যায়,শাংঘাই এ বসবাসকারী সুসি গাও নামের এক নারীর জীবনে, যিনি ই-কমার্সের সঙ্গে নিয়োজিত। মহামারীর দরুণ এ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় তিনি বর্তমানে অন্য কোনো কাজ খুঁজছেন। পাশাপাশি পরিবার সামলতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।

চই আরও বলেছেন, চীনে অবস্থানকরী কর্মহীন অনেকে এখন অভিবাসী কর্মী হিসেবে অন্য কোথাও কাজের সন্ধানে যাবে।আবার এ শহর ছেড়ে ছুটি কাটানোর জন্য যারা বাড়ি ফিরেছে, এ ভাইরাসের বিস্তৃতির কারণে তাদের পক্ষে ফিরে আসা সম্ভব হয়নি।

অভিবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে এরকম দীর্ঘ ছুটির কিছুটা ইতিবাচক দিক রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বেইজিং এর হু শিয়াওহোং নামের এক অভিবাসী কর্মীর কথা বলা যেতে পারে। লকডাউনের ফলে তিনি দীর্ঘদিন পর নিজ গৃহে স্বামী সন্তানদের সাথে বেশ কিছুদিন সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন।

ডিজিটাল নেটওয়ার্ক:

মানুষের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যেকোনো ধরনের মনমালিন্য কিংবা সমস্যা হলে খানিকটা স্বস্তির উদ্দেশে আশেপাশের মানুষদের কাছে প্রকাশ করা। কিন্তু এ ভাইরাসের প্রকোপে দীর্ঘদিন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার দরুন মানুষ এ ধরণের মানসিক সহায়তার সুযোগ ক্ষীণ হয়ে আসছে।পাশাপাশি বাইরে সম্পাদিত কর্মকাণ্ড গুলো ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থা আমাদের অনলাইনভিত্তিক মাধ্যমগুলোর উপর নির্ভর করে তুলছে।

চাইনিজ বিশ্ববিদ্যালয় অব হংকং এর এক মনোবিজ্ঞানী ফ্যানী চিউং এর মতে, অনলাইনভিত্তিক এ যোগাযোগ সকলের জন্য সহজলভ্য নয়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষেরা এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাথে তেমন পরিচিত নয়, যার ফলে তাদের পক্ষে ঘরের বাইরে যোগাযোগ সম্ভব হয়ে উঠছে না।

তরুণদের ক্ষেত্রে ঠিক এর বিপরীত চিত্র লক্ষ্যণীয়। অনলাইন প্রযুক্তি ব্যবহার তাদের জন্য সহজ বিধায় দিনের অধিকাংশ সময় তারা এর পেছনে ব্যয় করছে।। ভার্চুয়াল সম্পর্কে আবদ্ধতা তাদের বন্ধুর সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা জড়িয়ে যাচ্ছে একাকিত্বের সাথে। তবে শুধু বিচ্ছিন্নতা বা একাকিত্ব নয়, লকডাউনের এ দীর্ঘ সময় জুড়ে মানুষ তার পুরোনো অথবা বিদ্যমান সম্পর্ক পুনরায় মুল্যায়ন করে সম্পর্কে বুননে নতুন আশা খুঁজে পাচ্ছে। শ্রোফ এর মতে, নিজেকে উদঘাটন করারও বেশ চমকপ্রদ সময় এটি।

এ সম্পর্কে সুসি গাও বলেছেন, এ অসময় আমাদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে সুসময়ের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমি এবং আমার স্বামী নিজেদের মধ্যে এবং বাচ্চাদের সাথে যথেষ্ঠ সময় ব্যয় করছি। ফলে পারিবারিক বন্ধন মজবুত হচ্ছে ".।

বিদ্যমান সম্পর্কের ভিত্তি শক্ত করার পাশাপাশি বিবাহের মাধ্যমে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতাও গড়ে উঠেছে এ সময়। তাই উহানে শুধু মাত্র বিবাহ বিচ্ছেদ নয় বরং নতুন বিবাহ সম্পাদনের জন্য অনলাইনে অ্যাপোয়নমেন্টের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে।

মানসিক প্রভাব:

চীনসহ পুরো পৃথিবী করোনা ভাইরাসের প্রকোপের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। এ ভাইরাসের নিজস্ব ভোগান্তির পাশাপাশি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে মানুষকে।

শ্রোফ এর ভাষ্য মতে , আমরা দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে মানসিক রোগীর সংখ্যা সামাল দেয়া কষ্টসাধ্য হবে। ইতিপূর্বে ২০০২-২০০৩ সালের এক মহামারীতে এরকম মানসিক বিপর্যয়ের দৃষ্টান্ত দেখা যায়।

তবে পূর্বে উল্লেখিত বিষয়গুলোর মতই মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও কিছু ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে করোনা ভাইরাস। এর মাধ্যমে মানুষ তাদের পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। পরিবারের পাশাপাশি সরকারও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার্থে মনোযোগী হচ্ছে।

এ সম্পর্কে শ্রোফ বলেছেন, শুধু ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ নয়, মানসিক স্বাস্থের দিকটাও বিবেচনায় রাখতে হবে।

এরই মাঝে নিইরাম নামে হংকং এর একটি ডিজিটাল কোম্পানির কার্যনির্বাহী প্রধান মেগান লাম মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঠেকাতে প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার এরকম সুযোগ থাকলে মানুষের কর্মক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি ধারণা করছেন।

সর্বোপরি এই মহামারী মানুষের জন্য বিপর্যয়ের পাশাপাশি সমাজকে একসাথে আরও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

........

বিবিসি ফিউচারের প্রতিবেদন অবলম্বনে লিখেছেন-

মারিহা আক্তার

শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


সর্বমোট পাঠক সংখ্যা : ৩৪