৭ মিনিট আগের আপডেট; রাত ৪:০১; বুধবার ; ২১ অক্টোবর ২০২০

চকরিয়া সরকারী হাসপাতালে আড়াই মাসে একশ’ নরমাল ডেলিভারি

বাপ্পি শাহরিয়ার ১৪ অক্টোবর ২০২০, ১৮:২৪

চকরিয়ায় একটা সময় ছিল বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে নরমাল ডেলিভারি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এসব বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ব্যবসায়ীক কারণে সিজার করানোর জন্য আছে চিকিৎসকসহ এক শ্রেণীর দালাল চক্র। তার সাথে গ্রামের অদক্ষ, প্রশিক্ষণবিহীন দায়মা’ও আছে। দায়’মাদের কারণে প্রসবকালীন সময়ে প্রসূতি মায়েদের মৃত্যু ঝুঁকি থাকে।

দালাল চক্র ও অদক্ষ দায়’মাদের হাত থেকে প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ নরমাল ডেলিভারি করতেই চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২৬জুলাই থেকে ১৪অক্টোবর পর্যন্ত গত আড়াই মাসে প্রায় একশ’ ৮টি নরমাল ডেলিভাারি করে সফলতাও পেয়েছে চিকিৎসক টিমটি। ডেলিভারি রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে একটি হটলাইন নাম্বার চালু করা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদুল হকের নেতৃত্বে চিকিৎসক টিমটি সরকারী হাসপাতালের দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। 

চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, জুলাই মাসের শেষের দিকে হাসপাতালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদুল হক যোগদানের পর চিকিৎসকরা পুরোদমে একটি টিম গঠন করে নরমাল ডেলিভারি ওয়ার্ক শুরু করে। হাসপাতালের গেইট থেকে শুরু করে মুল ভবনের দেওয়ালে নানা প্রচারণায় কৌশলও কাজে লাগান। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার নিদের্শনায় দুইজন গাইনী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নরমাল ডেলিভারির কাজ করে যাচ্ছেন। এতে সর্বাক্ষণিক ৬জন নার্স (মিডওয়েফ) নরমাল ডেলিভারির কাছে নিয়োজিত রয়েছে। 

চকরিয়া পৌরসভার হাসপাতালপাড়ার আরিফুল ইসলামের স্ত্রী সুমি আক্তার (২২)। তার একটি সন্তান রয়েছে। প্রথম সন্তান তিন বছর হয়েছে। গত সোমবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরো একটি সন্তান জন্ম দিয়েছে তিনি। সরকারী এমন সেবায় তিনি ও তার পরিবার বেশ খুশি। 

হাসপাতালের বেডে সেবার মান নিয়ে জানতে চাইলে সুমি আক্তার বলেন, ‘এলাকার লোকজনের নানা কথায় অনেক ভয় পেয়েছিলাম। নিয়মিত চেকআপ করার সময় বেসরকারী একটি হাসপাতালে সিজার করার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু আমার স্বামী জানতে পারে সরকারী হাসপাতালে উন্নত সেবায় নরমাল ডেলিভারি করা হয়। এতে অনেকটা সাহস নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। সরকারী হাসপাতাল হলেও এখানে ডাক্তার ও নার্সরা অনেক আন্তরিক। এখানে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে একটি সন্তান ভুমিষ্ঠ হয়েছে। আমি এবং আমার শিশু সন্তান সুস্থ আছি।’ 

একই কথা বললেন বরইতলীর শান্তিবাজার গ্রামের মনিরুল ইসলামের স্ত্রী আরিন আক্তার (২০), পৌরসভার বাটাখালীর মো. ইউসুফের স্ত্রী ইয়াসমিন জন্নাত (১৯),  মৌলভীপাড়ার আলমগীরের স্ত্রী শাহিনা আক্তার (২৬)। মঙ্গলবার ও বুধবার বেলা (১টা পর্যন্ত) চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ২জনের নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। 

জানতে চাইলে চকরিয়া পৌরসভার সচেতন নাগরিক সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘আগে মানুষ সরকারী হাসপাতালের প্রতি বিমুখ হয়ে গিয়েছিল। সরকারী নানা সুবিধা এখন মানুষ সুফল পাচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মাহামুদুল হক যোগদানের পর সব বিষয়ে তিনি হাত দিয়েছে। বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে সিজারের মাধ্যমে অসহায় মানুষের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কৌশলটি বন্ধ করে সরকারী নরমাল ডেরিভারির সুফল পাচ্ছে চকরিয়ার লোকজন। এছাড়াও তিনি হাসপাতালের উন্নয়নে বেশ আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। এছাড়াও তিনি আসার পর থেকে হাসপাতালের দালাল প্রথাও বন্ধ হয়েছে। হাসপাতালে এখন দালাল প্রবেশ করতে পারে না। ’

চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সিনিয়র নার্স সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘এভাবে নরমাল ডেলিভারি হলে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত ও নিরাপদ হবে। দরিদ্রসহ সাধারন মানুষ অনেক খরচ থেকেও বাচঁবেন। এ হাসপাতালে ডেলিভারী নিরাপদ করতে আমিসহ৫ জন দক্ষ মিডওয়েফ কাজ করছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘এছাড়াও গর্ভবতী মহিলাদের নিয়মিত চেক-আপ, ডিএন্ডসি, এম.আরসহ নানা পরীক্ষা বিনামূল্য গর্ভবতী মহিলাদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। গত দুইদিনে হাসপাতালে গর্ভবতী ৬জন রোগী ভর্তি আছে। তাদের মধ্যে দুইজনের সফলভাবে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসব করা হয়েছে।’

চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদুল হক বলেন, ‘একটা সময় চকরিয়া সরকারী হাসপাতালে প্রসূতি মায়েদের নরমাল ডেলিভারি করানো প্রায়ই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চলতি বছরের জুলাই মাসে আমি যোগদান করার পর আমরা সবাই মিলে টিম ওয়ার্ক শুরু করি। দালাল চক্রের কিংবা দায়মা-দের বাধা উপেক্ষা করে এর সফলতা পেয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে যেখানে হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারী ১০/১৫ জন করা যেত। সেখানে দিন-দিন এটা বৃদ্ধি পেয়ে ২৬জুলাই থেকে ১৪অক্টোবর ১০৮জনকে নরমাল ডেলিভারী করানো হয়। এই অক্টোবর মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত ২৪টি সফল নরমাল ডেলিভারী করানো হয়েছে।’ 

তিনি বলেন, ‘নরমাল ডেলিভারি হাসপাতালে এসে করানোর সংখ্যা বাড়ছেই। কারণ হাসপাতালে নিরাপদে এ ডেলিভারি করানো হলে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে না। যদি ডেলিভারি রোগীকে অতি জরুরি সিজার করতে হয়, তাহলে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। ডেলিভারি হওয়ার পর উপজেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় জন্ম নেয়া শিশুর জন্য জামা-কাপড় এবং মশারী ওই শিশুর মাকে উপহার দেয়ার ব্যবস্থা করেছি।’ 


সর্বমোট পাঠক সংখ্যা : ৯৪৮